দৃষ্টিক্ষুধা

শিলা আকতার জান্নাতী


রিকশা থেকে নেমে গুটি গুটি পায়ে বাড়িটির দিকে এগিয়ে গেলো রাশি। বাড়িটিতে ঢুকবে নাকি ঢুকবে না এটা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পরে যায় সে। পরে সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে দৃষ্টিক্ষুধা নিবারণের লক্ষ্যে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করে।

কতশত স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই বাড়ির সাথে। এই বাড়ির আনাচেকানাচে কত্ত স্পর্শ লেগে আছে আমার, আমাদের ছোটবেলার। আমরা ছিলাম তিন ভাইবোন। বড় জুনায়েদ ভাইয়া, তারপর জারিফ ভাইয়া, আর তারপর আমি। আমাদের তিনজনের কলকাকলিতে বাড়ি মুখিয়ে থাকতো সবসময়। মাঝে মাঝে বাবা মা ও আমাদের সাথে খেলায় যোগ দিতো। সব কিছুই এখন ধূসর অতীত। সময় কত দ্রুত চলে যায়। একসময় এই বাড়িটিকে নিজের বাড়ি মনে করতাম। কেউ যদি জিজ্ঞাসা করতো "তোমার বাড়ি কোথায়?" ঝটপট এই বাড়ির ঠিকানা বলে দিতাম। এখন আর কেউ আমাকে জিজ্ঞাসা করে না "তোমার বাড়ি কোথায়?" এখন মানুষ জিজ্ঞাসা করে "তোমার বাবার বাড়ি কোথায়?" আর নয়তোবা "তোমার শশুরবাড়ি কোথায়?" বিয়ের পর নিজের বাড়ি বলতে কোনো জায়গা থাকে না। তবে মেয়েদের নিজস্ব কোনো বাড়ি নেই ঠিকই, কিন্তু আবার কোনো বাড়িই মেয়েদের ছাড়া সম্পূর্ণ হয় না।

বাড়িতে ঢুকে সোজা মায়ের রুমের দিকে পা বাড়ালাম। মায়ের রুমে যাওয়ার সময় বড়ভাবি আমাকে দেখে মুখটা কালো করে ফেললো। তারপর মুখে মেকি হাসি ফুটিয়ে বললো " কেমন আছো রাশি?" মলিন হাসি দিয়ে বললাম ভালো আছি ভাবি, তোমরা? ভাবি কোনো উত্তর দিলোনা। আমিও মায়ের রুমে আসার জন্য পা বাড়ালাম। মা চিংড়ি মাছ খেতে ভালোবাসে। তাই চিংড়ি মাছ এনেছি, নিজ হাতে রান্না করে দিবো। 

মায়ের রুমে ঢুকে দেখি মা নামাজ পড়তেছে। আসার পথে দেখলাম বাবা ও মসজিদের দিকে যাচ্ছে। মাছের পুটলিটা টেবিলে রেখে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিলাম। জার্নি তো আর কম হয় নি। পুরো চার ঘন্টা বাস জার্নি আবার দশ মিনিট রিকশায় ও আসতে হয়। 
নামাজ শেষে মা বলে উঠলো "কমন আছিস মা?" ভালো আছি। তুমি কেমন আছো মা? তোমরা কেমন আছো? " ভালো আছিরে পাগলী। খুশিতে মায়ের মুখটা ঝলমল করছে। তবুও মা কপট রাগের ভান করে বললো "কেনো এসেছিস এতোটা রাস্তা? শুধুমাত্র দেখার জন্য দুই সপ্তাহ পরপর এতোটা রাস্তা কেউ আসে?" আমিও মায়ের বলা কথাটা অনুকরন করে বললাম আর মা খিলখিল করে হেসে উঠলো, সাথে আমিও।

ফ্রেশ হয়ে প্রথমে বড় ভাবির কাছে গেলাম। ভাইয়া অফিসে গেছে আর বাচ্চারা স্কুলে। তারপর সংসার নিয়ে টুকিটাকি গল্প করার পর ছোটোভাবির কাছে গেলাম। সেখানেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করে বের হয়ে আসলাম। যদিও ভাবিদের কথা বলার কোনো আগ্রহ ছিলো না। আমি বকবক করলাম আর তারা হা হু করছিলো শুধু।
বাবা ও বাড়িতে এসেছেন দেখছি, কিছু সময় গল্প করে আমার আনা মাছগুলো নিয়ে রান্নাঘরে দিকে এগুলাম। বাড়িতে একটাই রান্নাঘর, ভাবিরাও এখন রান্না করছে হয়তোবা। ভাবলাম ভাবিদের সাথে গল্প করতে করতে রান্না করা যাবে কিন্তু রান্নাঘরের কাছাকাছি যেতেই যা শুনতে পেলাম তার জন্য আমি মানসিকভাবে মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। ছোটোভাবি বড়ভাবিকে বলছিলো "রাশি যে এত ঘন ঘন এখানে আসে আবার থেকেও যায় এটা কিন্তু আমার মোটেও ভালো লাগে না ভাবি।" হ্যা আমার ও। ওর ভাইরাও তো এতো আসা সহ্য করতে পারে না কিন্তু বুড়ো বুড়ির জন্য কিছু বলতে পারেনা উত্তর দিলেন বড়ভাবি।
কথা গুলো আমার পক্ষে হজম করা কষ্টসাধ্য ছিলো। তবুও হজম করে নিয়ে হাসিমুখে রান্নাঘরে ঢুকলাম, ভাবখানা এমন যেনো আমি কিছুই জানি না।

পরদিন সকাল দশটার দিকে বাবা মাকে ছবি তুলতে নিয়ে গেলাম। ছবি তুলে ছবিটা বড় করে বাধিয়ে নিলাম যাতে পরেরবার আসার ইচ্ছে টাকে একটু হলেও দমিয়ে রাখতে পারি। আসার সময় মাকে ওসব নিয়ে কিছু বললাম না শুধু বললাম পরেরবার আসতে দেরি হবে হয়তো। মা করুণ চোখে তাকালো। চোখটা ভিজে যাচ্ছিলো তাই তড়িঘড়ি করে রিকশায় উঠলাম। প্রিয়জনদের পিছনে ফেলে এগিয়ে চলল রিকশাটা।

আমি জানি ছবি দেখে, ভিডিও কলে কথা বলে কখনো দৃষ্টিক্ষুধা মেটে না। ক্ষুধা লাগলে যেমন কিছু খেয়ে ক্ষুধা মেটাতে হয় ঠিক তেমনি দৃষ্টিক্ষুধায় কাতর মানুষকেও যার জন্য সে ক্ষুধার্ত তাকে দেখে মনকে শান্ত করতে হয়। আমাকে আবার খুব তাড়াতাড়ি আসতেই হবে আমার ক্ষুধা মেটানোর জন্য। পেটের ক্ষুধা না কিন্তু, দৃষ্টিক্ষুধার জন্য।