গল্প : সন্দেহ

লেখা: #নুসরাত_জাহান

পর্ব: ১

বাসর রাতে স্বামী_স্ত্রীর রোমান্টিক ভালোবাসার শুরুতে সব ঠিকঠাক থাকলে ও শেষের দিকে চিৎকার দিয়ে উঠল নীল। মেজাজটা পুরোই বিগড়ে গেলো।
কী ব্যাপার মেঘলার ব্লিডিং হলো না কেনো??? তাহলে কী মেঘলা ভার্জিন নয়।

তনু আপু তাহলে জেনে শুনে এতবড় ধোঁকা দিলো নিজের ছোট ভাইকে। না না এটা হতে পারেনা। 
একই প্রশ্ন নীলের মাথায় বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে। 
নীলের এতদিনের জানা মতে বাসর রাতে নতুন বউয়ের রক্তে সাদা চাদর হয়ে উঠবে রঙিন। যেটা এতদিন সে বন্ধুদের কাছ থেকে শুনে এসেছে। একমাত্র এটা দেখেই চেনার উপর যে মেয়েটি ভার্জিন।

কিন্তু এখন তো দেখছি তার কোন কিছুই না। আপুর সাথে সাথে মেঘলা ও আমার সাথে প্রতারণা করেছে। 
নিজের সতিত্ব আগেই বিলিয়ে দিয়ে অবশেষে আমার গলায় এসে ঝুলে পড়েছে। ছিঃ ছিঃ এটা হতে পারেনা। এমন নোংরা চরিত্রের মেয়েকে নিয়ে সংসার করা যাবেনা।

বিয়ের প্রস্তাবটা প্রায় ৬ মাস ধরে চলছিল। সেই থেকেই ওর সাথে পরিচয়। কিন্তু ওকে দেখলে তো বোঝাই যায় না ওর চরিত্র এতটাই খারাপ। প্রচন্ড রাগে জ্বলছিল নীল। মাথাটা এতটাই গরম হয়েছে যে চাল বসিয়ে দিলে সেটাও সিদ্ধ হয়ে যাবে।

মেঘলা ঘুমুচ্ছে। ফ্লোরে হা পা মেলে দিয়ে দুহাত দিয়ে নিজের চুল নিজেই টানছে নীল। আর বারেবারে বিছানার দিকে তাকাচ্ছে।
*
**
*
হঠ্যাৎ মধ্যরাতে ঘুম ভাঙে মেঘলার। চোঁখ মেলে তাকায় সে। ফ্লোরে আবছা ভাবে নীলকে দেখে চোঁখ কচলাতে কচলাতে বলল তুমি এখন ও বসে আছো যে???

নীল চোখ তুলে তাকালো মোহনার দিকে। রাগি লুকে চোখদুটো বড়বড় করে তাকায় মেঘলার দিকে।
*
মেঘলা মনে মনে ভাবছে কী ব্যাপার নীল এভাবে তাকাচ্ছে কেনো??? চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। হঠ্যৎ এত রাগ দেখাচ্ছে কেনো??? এতক্ষণ তো সব ঠিকঠাকই ছিল। তাহলে এমন করছে কেনো??

নীল বসা ছেড়ে উঠে এসে মেঘলাকে চেপে ধরে বলল এত বড় প্রতারণা কেনো করলে আমার সাথে??

আমার বোন তনুকে ও হাত করে নিলে। 
মেঘলা তো রীতিমত অবাক হয়ে গেলো। এত রাতে এসব কী বলছে সে। আজ তাদের বাসর রাত কোথায় দুটো ভালোবাসার কথা বলবে তা না করে প্রশ্ন করছে।

-"নীল তুমি এসব কী বলছো???? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।

-"মুখটা ভেংচিং কেটে অন্য দিকে তাকিয়ে বলল থাক হয়েছে এখন আর ন্যাকা সাজতে হবেনা। আমার যা বোঝার আমি বুঝতে পেরেছি।
যাই হোক। আমার ভাগ্যে এটাই ছিল তাই পেয়েছি আর কিছু না।

এখন যাও ঘুমিয়ে পড়ো।

হা হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল মেঘলা। মাথায় কিছু কাজ করছে না। কিছুক্ষণ আগে ও তাদের ভিতরে একটা রোমান্টিক ভালোবাসা তৈরি হলো কিন্তু দেড় ঘন্টার ভিতরে সব পরিবর্তন হয়ে গেলো।

নাকি আবার মজা করছে।

না এটা কোন মজা করার কারন হলো নাকি! তা ও আবার এত রাতে????
তাহলে কী নীলের সাথে অন্য কারো সম্পর্ক আছে। যার জন্য এমন করছে।

কিন্তু তনু আপু কী যেনে শুনে আমার সাথে এমন করবে?? হতে ও পারে এত ভালো জব করে কাউকে পছন্দ করতেই পারে এতে বিশ্বাস না করার কিছু নেই। 
যদি কাউকে পছন্দ করে ও থাকে সেটা তো তার অতীত। তাছাড়া বিয়ের আগে তার সাথে আমার ৬ মাসের পরিচয় ছিল। দুজনের ভিতরে আন্ডারস্ট্যান্ডিং তো ভালোই ছিলো।

প্রতিটা মেয়ে কী চায় তার স্বামীর কাছে,,,কেয়ারিং,,শেয়ারিং,, আন্ডারস্ট্যান্ডিং,,আর ট্রাস্ট এই ৪ টা জিনিস। এগুলো থাকলেই সংসারের কখন ও ভুল বোঝাবুঝি কিছুই হয় না।

নীল বিছানার অন্য পাশে কাৎ হয়ে গায়ে কাঁথা জড়িয়ে শুয়ে পড়ল। 
মেঘলা তো রীতিমত মতো হতভম্ভ হয়ে যায় এত গরমের ভিতরে গায়ে কাঁথা জড়িয়ে শুয়ে পড়ল।

মেঘলার চোঁখে ও প্রচন্ড ঘুম ঘুম ভাব। বিয়ে উপলক্ষে বেশ কয়েকদিন ঘুমাতে পারেনি সে।

নীলের পাশের বালিশে চুলগুলো এলিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়ল।

সকাল ৭ টা.....

বাহিরের চিৎকার চেঁচামেচিতে ঘুম ভাঙল মেঘলার। 
টাওয়াল নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকল। প্রায় ১ ঘন্টা ধরে শাওয়ার নিয়ে ভিজা চুলগুলো টাওয়ালে পেঁচিয়ে বেরিয়ে আসল। বিছানার দিকে তাকাতেই দেখল নীল ঘুমুচ্ছে।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখছে মেঘলা। 
মনে মনে ভাবছে নীলকে কী ডাকবো????
আবার যদি রাগ করে। এমনিতেই রাতে অনেক দেরী করে ঘুমিয়েছে।

মেঘলা আয়নার সামনে দাঁড়িয় দাঁড়িয়ে নীলকে দেখছে।
ঘুম জড়ানো চোখে ভালো লাগছে নীলকে। বিয়ের আগে তেমন একটা ভালো লাগেনি নীলকে।

আড়মোড়া দিয়ে চোখ মেলে তাকিয়ে মুখটা বাঁকিয়ে বিছানা দিয়ে নামল নীল।

মেঘলা ও কিছু বলল না। 
টাওয়ালটা হাতে নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকল নীল। 
প্রায় ৩০ মিনিট পরে শাওয়ার নিয়ে বেড়িয়ে আসল।
মেঘলা একচুল ও জায়গা থেকে সরেনি। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী যানি ভাবছে।

নীল এসে টাওয়ালটা বেলকুনির দড়িতে ঝুলিয়ে রুমে এসে বিছানার উপরে বসল।

হঠ্যাৎ বাহির থেকে ডাকাডাকি,,,নীল তুই কী নাস্তা করবি না??? নাকি বউয়ের আঁচলের নিচে এখন ও ঘুমিয়ে থাকবি। তোদের জন্য সবাই অপেক্ষা করছে। জলদী আয় তো একত্রে নাস্তা করবো।

-"আসছি আপু।

নীল মেঘলার দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে বলল,,,
চলো আপু নাস্তার টেবিলে ডাকছে।

মেঘলা মাথায় ঘোমটা টা টেনে দিয়ে নীলের পিছনে পিছনে গেলো।

ডাইনিং টেবিলে সবাই অপেক্ষা করছিলো ওদের জন্য।
মেঘলা মাথা নিচু করে নীলের এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
তনু আপু হো হো করে হেসে উঠল।
মেঘলা মাথাটা তুলে তনু আপুর দিকে তাকিয়ে আবার ও মাথাটা নিচু করে রাখলো।
-"আপু কী হয়েছে হাসছো কেনো??
-"এমনি হাসলাম নীল।

তনু আপু এগিয়ে এসে মেঘলার হাতটা ধরে চেয়ারে বসিয়ে দিলো। নীল এসে মেঘলার বিপরীত পাশে বসল।
নীলের মা সালমা বেগম প্লেটে নাস্তা বেরে দিলো।

মেঘলার বেশ আনইজি লাগছে। নতুন পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিতে অনেকটা সময় লাগবে তার।

নীলের বড় ভাবী এসে মেঘলার পাশের চেয়ারটাতে বসল।
সে ঘুরেঘুরে মেঘলার দিকে তাকাচ্ছে। বিষয়টা প্রথমে লক্ষ্য না করলে ও কিছুক্ষণ পরে বুঝতে পারলো মেঘলা।
নীলের বড় ভাবী মেঘলার থেকে বয়সে ছোট হবে। দেখতে খুবই স্মার্ট সে। যেকোন ছেলে দেখলেই পছন্দ করবে। তার সামনে মেঘলা কিছুই না।

নীলের মা বলল মেঘলা খাচ্ছো না কেনো??? 
নীলের মায়ের ডাকে কল্পনার রাজ্য থেকে বেরিয়ে এসে বলল,,,জ্বি মা খাচ্ছি।
মেঘলা খাচ্ছে।

একটু পরপর মেঘলা আড়চোখে নীলের ভাবী তিনাকে দেখছে। তিনা মুখে হাত দিয়ে নীলকে দেখে হাসছে।
নীল ও ফাঁকে ফাঁকে তিনার দিকে তাকাচ্ছে।
মেঘলা তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করে উঠে বেসিনে গিয়ে হাত ধুয়ে নিজের রুমে গিয়ে বসল।

একদম ভালো লাগছে না। এটা আবার কী দেখলাম। তাহলে কী তিনা ভাবীর সাথে নীলের কোন চক্কর চলছে না তো?? 
তনু আপু তো বলেছিলো নীলের কারো সাথে এ্যাফেয়ার আছে। কিন্তু তারা সেখানে রাজি না বলেই আমার সাথে বিয়েটা দিলো। তাহলে কী আপু যেনে শুনে আমার সাথে প্রতারণা করেছে।

কথাগুলো কিছুতেই ভাবতে পারছে না মেঘলা। সারারাত সে ঠিকভাবে ঘুমায়নি আর এখন সকালে উঠেই ড্রামা দেখা লাগছে।

নীলকে সরাসরি জিজ্ঞাস করতে হবে।

একটুবাদেই নীল রুমে আসল।
নীলের আসার শব্দে পিছনে ফিরে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে এগিয়ে গেলো মেঘলা। মেঘলাকে দেখে ও না দেখার ভান ধরে ওয়াশরুমে ঢুকল নীল। একটু পরে বেরিয়ে এসে বিছানার উপরে শুয়ে পড়ল।
মেঘলা গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে নীলকে জড়িয়ে ধরে বলল কী ব্যাপার আমার মহারাজের কী মন খারাপ??? নতুন বউকে একা রেখে ঘুরছে এটা কী ঠিক।
নীল কোন উত্তর দিচ্ছে না চুপ করে মাথা নিচু করে আছে।
মেঘলা নীলের মাথা তুলে নিজের ঠোঁট দিয়ে তার ঠোঁটে ডুবিয়ে দিলো।
নীল বিরক্ত হয়ে মেঘলাকে সরিয়ে দিয়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়।

মেঘলা কিছু বুঝতে না পরে নীলের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। মেঘলাকে দেখে নীল সাপের মতো ফোসফোস করতে লাগলো।
-"কী হয়েছে তোমার??? এমন বিহেভ করছো কেনো?
-'নিশ্চুপ নীল।

-"মেঘলা পিঠে হাত দিতেই নীল মেঘলার হাতটা ছিটিয়ে দিয়ে বলল ডোন্ট টার্চ মি। তোমার ওই পাপিষ্ঠ হাত দিয়ে আমাকে ধরবেনা। তোমার ওই নোংরা মুখ দেখলে ও আমার ঘৃণা লাগছে।

-"নীলের মুখে এমন জঘন্য কথা শুনে মেঘলার চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগলো।
কোন কথা বলতে পারছে না মেঘলা। হঠ্যাৎ করে নীল এসব কী বলছে?? আমি নোংরা মেয়ে?? ছিঃ নিজের কাছে নিজেকে ঘৃণা লাগছে।

নীল তুমি এসব কী বলছো??? তোমার মাথা কী ঠিক আছে??? তুমি আমাকে এসব কথা বলতে পারলে??

-"নীল চোখ মুখ লাল করে বলল হ্যাঁ বলতে পারলাম কারনে তোর সাথে তুহিনের রিলেশন ছিল জানাতাম কিন্তু তুই যে বিয়ের আগেই সব কিছু বিলিয়ে দিয়ে এসেছিস সেটা তো জানাতাম না। তনু আপু আমাকে শেষ পর্যন্ত অসতী একটা মেয়েকে গলায় ঝুলিয়ে দিলো। উফফফ ভাবতে পারছিনা। নিজের রক্তের বোন এমন প্রতারণা করবে।

-"নীল তুমি এসব কী বলছো??? আমি অসতী কীভাবে হলাম?? 
হ্যাঁ আমি মানছি তুহিনের সাথে আমার রিলেশন ছিল কিন্তু তাই বলে কী আমি বিয়ের আগে সব কিছ বিলিয়ে দিয়ে এসেছি??? তুমি এটা কীভাবে জানলে যে আমি অসতী??? তুমি কী আমার আর তুহিনের সাথে ছিলে??

-"মুখ সামলে উত্তর দে। তোর ওই নষ্ট মুখে কোন কথা শুনতে চাইনা। তুই যদি ভার্জিন থাকতি তাহলে প্রথম রাতে তোর ব্লিডিং হলো না কেন????
বল উত্তর দে??? আছে তোর কাছে উত্তর???

-"এটা তুমি কী বলছো নীল?? ব্লিডিং হয়নি বলে আমি ভার্জিন না?? কী সব অশিক্ষিত লোকদের মতো কথা বলছো???

-"কী বললি তুই?? যত বড় মুখ নয় ততো বড় কথা। নষ্টা মেয়ে হয়ে নিজের দোষগুলো লুকাতে চাচ্ছিস। শোন আমি এত বোকা নই তুই আমাকে বলবি আর আমি মেনে নিবো।

-"চুপ করো তুমি। তোমার মুখের ভাষা এতটা নোংরা জানলে তোমাকে বিয়েই করতাম না। তোমার থেকে তুহিন হাজারগুন ভালো ছিল।

-"কী বললি তুই। আমি ভালো না তুহিন ভালো ছিলো। তা তো ভালো হবেই। বিয়ের আগে তো দুজনে ইনজয় করতি আর মজা পাইতি।

-"মেঘলা রুম থেকে বেরিয়ে যেতে নিলে নীল মেঘলাকে টেনে গালে ঠাসঠাস চড় বসিয়ে দিয়ে রুম থেকে বেড়িয়ে গেলো।

মেঘলা ফ্লোরে বসে পড়ল। চোঁখ দিয়ে তার পানি পড়তে লাগলো। কোথায় এসে পড়লো সে???

স্বামী নামের জানোয়ারের কাছে।

চলবে........