কেবিন নাম্বার ২৩ ★
টেবিলের উপর রক্ত মাখা হাতের ছাপ, মেঝেতে জমাট বাঁধা রক্ত নামক তরল, তার উপরে নিপ খোলা একটা কলম রক্তে ডুবে আছে। মনে হচ্ছে কলমটার ভিতর থেকেই রক্তগুলো মেঝেতে পড়েছে। আর তার ঠিক পাশে একটা নিথর দেহ পড়ে আছে।
স্নিগ্ধার নিথর দেহ! স্নিগ্ধার মাথাটাকে নিজের কোলের মধ্যে নিয়ে মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে উৎস। যেনো স্নিগ্ধা পরম শান্তিতে ঘুমাচ্ছে, আর মুগ্ধ নয়নে উৎস সেটা দেখছে। স্নিগ্ধাকে খুনটা উৎসই করেছে। পুলিশ বিষয়টাকে খুটিয়ে খুটিয়ে তদন্ত করে দেখছে। উৎসকে অনেকবার স্নিগ্ধার থেকে আলাদা করার চেষ্টা করা হয়েছে। যখন অনেক চেষ্টা করেও হলো না তখন পুলিশ ব্যার্থ হয়ে উৎসকে বেঁধে রেখে স্নিগ্ধার লাশ মর্গে পাঠিয়ে দিলো।
পুলিশ ঘরের ভিতরটা খতিয়ে দেখছে। তাদের বেশি পরিশ্রম করতে হলো না , কারণ খুনটা হয়েছে হল রুমে, আর সে রুমে সিসি ক্যামেরা লাগানো ছিলো। তারা ক্যামেরা ফোটেজ দেখা শুরু করলো। আজকে সকাল থেকের ফোটেজ প্রথমে দেখা শুরু করলো। স্নিগ্ধা খুন হবার ঠিক কিছুক্ষণ আগে স্নিগ্ধা সোফায় বসে টিভি দেখে হাসছিলো, কলিং বেল এর শব্দ শুনে দরজা খুলে দিয়ে হাসি মুখে উৎসের সাথে ভিতরে আসলো। কিন্তু উৎস কেন জানি রাগে রক্তিম হয়ে চিৎকার করছে কথা গুলো ক্লিয়ার শোনা যাচ্ছে না, কিন্তু উৎস স্নিগ্ধার দিকে আঙুল না তুলে পাশে কার দিকে যেনো আঙুল তুলে চিৎকার করে শাসিয়ে কথা বলছে।
স্নিগ্ধা উৎসকে শান্ত করার চেষ্টা করছে কিন্তু হঠাৎ উৎস টেবিলের উপর রাখা ফল কাটার ছুড়িটা হাতে নিয়ে এলোমেলো ভাবে হাওয়ায় চালাচ্ছে মনে হচ্ছে কাকে যেনো মারছে, কিন্তু সেখানে মানুষের কোন অস্তিত্ব নেই। পরোক্ষনে উৎস ছুড়িটা স্নিগ্ধার পেটে ঢুকিয়ে দিলো। স্নিগ্ধা নিজের পেট চেপে ধরলো, ওর রক্ত মাথা হাতটা দিয়ে টেবিল ধরার চেষ্টা করে, মেজেতে লুটিয়ে পরে। ধীরে ধীরে স্নিগ্ধার দেহটা নিস্তেজ হয়ে পরে। পরোক্ষণেই উৎস পাগলের মত হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে। উৎসর চেহারার রাগী ভাবটা বিলীন হয়ে সেখানে কষ্ট রেখা ফুটে উঠে। উৎসের এমন আচরন দেখে পুলিশসহ সবাই হতভম্ব হয়ে যায়। পুলিশকে ফোনটা উৎসই করে বলেছে ওর স্ত্রী খুন হয়েছে।
পুলিশ সব কিছুর তদন্ত নিয়ে জানতে পারে উৎস প্রায় অনেক বছর ধরে মানসিক ভাবে অসুস্থ। বিয়ের আগে দু তিন বছর যাবত মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসাও হয়েছিল ওর। স্নিগ্ধা সে হাসপাতালের নার্স ছিলো। তখন স্নিগ্ধাই ওকে সুস্থ করে তুলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনে। তারপর দুজন বিয়ে করে কিন্তু কিছুদিন যাবত উৎসর পুরোনো রোগটা আবার দেখা দেয়। ও সবসময় ইমাজিন করতো স্নিগ্ধার অন্য কোন ছেলের সাথে সম্পর্ক চলছে।
এটা স্নিগ্ধা বুঝতে পেরে কদিন আগে ওকে ডাক্তারও দেখায়, ডাক্তার ওকে হাসপাতালে রেখে যেতে বলে কিন্তু স্নিগ্ধা নিজে উৎসের দেখাশুনা করতে চেয়েছিলো। তাই স্নিগ্ধার ভালোবাসার প্রমাণ হয়তো নিজের জীবন দিয়ে দিতে হলো। পুলিশ তদন্ত করে উৎসের এই রোগের পিছনে কারণ হিসাবে পেলো উৎস যখন পনেরো বছর বয়স তখন ওর মা ওর বাবাকে ফেলে অন্য লোকের সাথে চলে যায়। তখন থেকেই মেয়েদের উপর একটা ঘৃণার জন্ম হয় উৎসের মনে। ওর মতে সব মেয়েই বিয়ের পর পরকিয়া করে। আর ঘৃণার পরিমানটা এতটা বেড়ে যায় যে, যেটা থেকে কঠিন মানসিক রোগের সৃষ্টি হয়। উৎস সবসময় একটা ছেলেকে ইমাজিন করতো যে কিনা স্নিগ্ধার সাথে রিলেশনে আছে।
উৎস এখন আবার সেই হাসপাতালের কেবিন নাম্বার ২৩ এ আছে। এই কেবিন থেকেই স্নিগ্ধা ওকে সুস্থ করে স্বাভাবিক জীবনে নিয়ে গেছিলো। আর সেই স্নিগ্ধাকে খুনের দায়ে আজ সেই ২৩ নাম্বার কেবিনে আবার উৎসকে রাখা হয়। উৎস এখনো জানে না স্নিগ্ধা মরে গেছে, ওর মতে স্নিগ্ধা সারাক্ষণ ওর সাথে থাকে। উৎস একা একা স্নিগ্ধার সাথে কথা বলে, হাসে, কাঁদে কেবিন নাম্বার ২৩ বসে।
পৃথিবীটা সত্যিই গোল, এখানে কেউ কোন জিনিস থেকে পালাতে চাইলে ঘুরে ফিরে আবার সেখানেই আসে। যেমন উৎস সবসময় চাইতো কেবিন নাম্বার ২৩ তার সাদা দেয়াল আর ছোট্ট একটা জানালা তার থেকে মুক্তি পেতে আর সেই কেবিন, কেবিনের রংহীন ধবধবে সাদা দেয়াল আর ছোট জানালাটাই ওর স্থায়ী ঠিকানা হলো। সত্যিই পৃথিবী গোল।
সমাপ্ত


0 Comments